প্রভুর সান্নিধ্যে নবীজির প্রেমভ্রমণ মিরাজ

নবুয়তপরবর্তী দীর্ঘ ১০ বছর ধরে কাফেরদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও অমানবিক অত্যাচার, সেইসঙ্গে পরম শ্রদ্ধেয় চাচা হজরত আবু তালেব ও প্রাণপ্রিয় সহধর্মিণী হজরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকাল এবং তায়েফবাসীর নির্মম নির্যাতন-একের পর এক এরূপ মর্মান্তিক ঘটনায় হজরত রাসূল (সা.) সীমাহীন কষ্টের সাগরে নিমজ্জিত হয়ে পড়েন। সন্তান কষ্ট পেলে মা যেমন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন, ঠিক তেমনিভাবে পরম দয়াময় মহান আল্লাহ তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু হজরত রাসূল (সা.)কে মিরাজের মাধ্যমে নিজের একান্ত সান্নিধ্যে নিয়ে সব দুঃখ-কষ্ট ভুলিয়ে দেন।

‘মিরাজ’ আরবি শব্দ, যার বাংলা অর্থ-ঊর্ধ্বলোকে ভ্রমণ, পথ, সিঁড়ি, ইত্যাদি। হজরত রাসূল (সা.)-এর মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে (জেরুজালেম) উপনীত হওয়া এবং সেখান থেকে সপ্ত আকাশ ভ্রমণ করে আল্লাহর সান্নিধ্যে উপস্থিত হওয়ার ঘটনাকেই মূলত মিরাজ বলা হয়ে থাকে। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ বর্ণনাগুলোর আলোকে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর মিরাজের ঘটনাটি সংক্ষেপে উপস্থাপন করছি-

নবুয়তের ১১তম বর্ষের ২৭ রজব রাতে আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর নিজ গৃহে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি দেখলেন-তাঁর ঘরের ছাদ উন্মুক্ত হয়ে গেল এবং হজরত জিবরাইল (আ.) আরও কয়েকজন ফেরেশতা নিয়ে অবতরণ করলেন। জিবরাইল (আ.) অত্যন্ত আদবের সঙ্গে সালাম দিয়ে জানালেন যে, মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বন্ধু রাসূলুল্লাহ (সা.)কে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে আরশে আজিমে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। অতঃপর জিবরাইল (আ.) তাঁকে পবিত্র কাবার হাতিমে নিয়ে যান। সেখানে আবার তন্দ্রাচ্ছন্ন হওয়ার পর জিবরাইল (আ.) ও মিকাইল (আ.) তাঁকে জমজম কূপের কাছে নিয়ে শায়িত করেন। তারা আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর বক্ষ বিদীর্ণ করে তাঁর পবিত্র হৃৎপিণ্ডটি বের করে আনেন এবং জমজমের পানি দিয়ে তা ধুয়ে পরিষ্কার করেন। এরপর নুর ও হিকমতে (প্রজ্ঞা) পরিপূর্ণ একটি স্বর্ণের পেয়ালা থেকে নুর তাঁর হৃদয়ে ঢেলে দেওয়া হয় এবং হৃৎপিণ্ডটি আবার যথাস্থানে স্থাপন করা হয়। এটি ছিল হজরত রাসূল (সা.)-এর জীবনের চতুর্থ ও সর্বশেষ ‘সিনাচাক’ বা বক্ষ বিদীর্ণ করার ঘটনা।

সিনাচাকের পর হজরত রাসূল (সা.)-এর কাছে বোরাক নিয়ে আসা হলো। বোরাক হচ্ছে একটি বেহেশতি প্রাণী, যা ছিল অত্যন্ত দ্রুতগতির বাহন। এরপর হজরত রাসূল (সা.) বোরাকের পিঠে চড়ে বসলেন। তখন বোরাক তাঁকে নিয়ে আকাশে উড়ে বিদ্যুৎগতিতে চলতে লাগল। আর হজরত জিবরাইল (আ.)ও তাঁর পাশে পাশে চলতে লাগলেন। এভাবেই হজরত রাসূল (সা.) মক্কা মোকাররমার বায়তুল হারাম (কাবাঘর) থেকে জেরুজালেমের বায়তুল মুকাদ্দাসের উদ্দেশে সায়ের বা পরিভ্রমণ শুরু করলেন। পবিত্র কাবাঘর থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস যাওয়ার পথে আল্লাহর রাসূল (সা.) সৃষ্টিজগতের বহু বিস্ময়কর ঘটনাবলি প্রত্যক্ষ করেন। যাত্রাপথে তিনি জান্নাতের মোহনীয় সুঘ্রাণ ও এর অতুলনীয় সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন এবং জাহান্নামের ভয়াবহ অন্ধকার ও আগুনের লেলিহান শিখা দেখে ব্যথিত হয়ে উম্মতের মায়ায় অঝোর নয়নে কাঁদতে থাকেন।

এভাবে ঊর্ধ্বাকাশে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মহান আল্লাহর সৃষ্টিজগতের বহু আশ্চর্য নিদর্শন ও বিস্ময়কর ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে করতে হজরত রাসূল (সা.) মসজিদুল আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে বোরাক থেকে সেখানে অবতরণ করলেন। তারপর আল্লাহর রাসূল (সা.) বোরাককে বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি দরজার কড়ার সঙ্গে বাঁধলেন। মসজিদুল আকসাতে আগে থেকেই সব নবী-রাসূল আল্লাহর শ্রেষ্ঠ হাবিব (সা.)কে সাদর সম্ভাষণ জানানোর জন্য বিনীতভাবে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন। অতঃপর মহান আল্লাহর নির্দেশে হজরত রাসূল (সা.)-এর ইমামতিতে সব নবী-রাসূল ২ রাকাত সালাতুল ইসরা অর্থাৎ ভ্রমণের নামাজ আদায় করেন। এ নামাজের মাধ্যমেই হজরত রাসূল (সা.) আনুষ্ঠানিকভাবে মহান আল্লাহ প্রেরিত সব নবী-রাসূলের ‘ইমাম’ হিসাবে উপাধি লাভ করে ‘ইমামুল মুরসালিন’-এর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন।

আম্বিয়ায়ে কেরামের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হজরত রাসূল (সা.) হজরত জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে সপ্ত আকাশে সায়ের বা পরিভ্রমণ শুরু করলেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) যখন প্রথম আকাশে প্রবেশ করলেন, তখন সেখানে হজরত আদম (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। এরপর তিনি দ্বিতীয় আকাশে উপনীত হলেন। এখানে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর সঙ্গে হজরত ইসা (আ.) ও তার খালাতো ভাই হজরত ইয়াহহিয়া (আ.)-এর সাক্ষাৎ হলো। তারপর হজরত রাসূল (সা.) তৃতীয় আসমানে উঠে এলেন। এখানে হজরত ইউসুফ (আ.)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হলো। তার সঙ্গেও আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর সেই ধরনের সালাম ও সম্ভাষণ বিনিময় হলো, যেমনটি আগের দুটি আকাশে হয়েছিল। এরপর হজরত রাসূল (সা.)-এর সঙ্গে চতুর্থ আকাশে হজরত ইদরিস (আ.), পঞ্চম আকাশে হজরত হারুন (আ.) এবং ৬ষ্ঠ আকাশে হজরত মুসা (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। অতঃপর হজরত রাসূল (সা.) যখন সপ্তম আকাশে আরোহণ করলেন, তখন তিনি দেখতে পেলেন হজরত ইবরাহিম (আ.)কে। ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে হজরত রাসূল (সা.) সিদরাতুল মুনতাহায় (সীমান্তবর্তী কুল বৃক্ষ) উপনীত হলেন। সিদরাতুল মুনতাহার নিকটবর্তী বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করার পর হজরত জিবরাইল (আ.) অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে হজরত রাসূল (সা.)কে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সিদরাতুল মুনতাহা অতিক্রম করার এখতিয়ার আমার নেই। আমি যদি আর একটু অগ্রসর হই, তাহলে আমার পাখাগুলো জ্বলে ছাই হয়ে যাবে!’ এ কথা বলে হজরত জিবরাইল (আ.) আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।

হজরত জিবরাইল (আ.) বিদায় নেওয়ার পর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হজরত রাসূল (সা.)-এর কাছে ‘রফরফ (সবুজ মখমলের বিশেষ আসন )’ প্রেরণ করা হলো। অতঃপর ‘রফরফ’-এ চড়ে তিনি চোখের পলকে ৭০ হাজার নুরের পর্দা অতিক্রম করে আল্লাহতায়ালার আরশে আজিমে উপস্থিত হলেন। এভাবে আল্লাহর রাসূল (সা.) আপন প্রভুর একান্ত সান্নিধ্যে পৌঁছে গেলেন। তির-ধনুকের যতখানি নিকটবর্তী থাকে, হজরত রাসূল (সা.) তখন মহান রাব্বুল আলামিনের ততটাই নিকটবর্তী হয়ে গিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ ও হজরত রাসূল (সা.)-এর এ নিকটবর্তী অবস্থাকে পবিত্র কুরআনে ‘কাবা কাওসাইন’ অর্থাৎ তির-ধনুকের নিকটবর্তী অবস্থা বলা হয়েছে। তারপর শুরু হলো মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর একান্ত প্রেমালাপ-যা ছিল মহাবিশ্বের সৃষ্টির মহাপরিকল্পনা, সৃষ্টিকূলের জাহের-বাতেন এবং ভেদ-রহস্য নিয়ে। এ সময় মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বন্ধুকে আত্মিকভাবে শক্তিশালী করেন এবং তাঁকে শরিয়তের বিভিন্ন হুকুম-আহকাম প্রদান করেন। এরপর আল্লাহতায়ালা হজরত রাসূল (সা.)-এর ওপর সূরা বাকারার শেষের দুটি আয়াত নাজিল করেন। অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষণা আসে-দৈনিক ৫ ওয়াক্ত নামাজ নির্ধারণ করা হলো, যার ফজিলত পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান!

মহান আল্লাহর এ ঘোষণা শুনে হজরত রাসূল (সা.) আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে দুনিয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলেন। হজরত রাসূল (সা.) যে পথে ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেছিলেন, ঠিক সে পথ ধরেই বোরাক বাহনে সায়ের করে নিজ গৃহে ফিরে আসেন। মিরাজ থেকে ঘরে ফিরে এসে আল্লাহর রাসূল (সা.) লক্ষ করলেন, যে বিছানায় তিনি শায়িত ছিলেন, সে বিছানাটি তখনো উত্তপ্ত। আর ঘরের যে দরজা দিয়ে হজরত জিবরাইল (আ.) তাঁকে কাবাঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই দরজাটির কড়া তখনো নড়ছে। এ দৃশ্য দেখে হজরত রাসূল (সা.) বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে রইলেন।

মিরাজের মহিমান্বিত এ সফরের সবচেয়ে বড় উপহার হলো ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ’। মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে একাগ্রতার সঙ্গে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার তৌফিক দান করুন এবং আমাদের প্রত্যেকের নামাজকে মুমিনের মিরাজ হিসাবে কবুল করে নিন। আমিন।

লেখক :
সৈয়দ এ. এফ. এম. মঞ্জুর-এ-খোদা
সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদে

FLOW FACEBOOK

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Gravatar profile

Translate »