Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124
Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124

আল্লাহ্র রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যুগে শহরবাসী আরবরা প্রধানত ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমেই জীবিকা উপার্জন করত। এরই ধারাবাহিকতায় হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পূর্বপুরুষগণও ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তারা ছিলেন তৎকালীন মক্কার স্বনামধন্য ও ধনাঢ্য আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী। এ কারণে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-ও শৈশব থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে খুব ভালোভাবেই পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে, চাচা হজরত আবু তালেব (রা.)-এর সঙ্গে আরবের বিভিন্ন স্থান ও সিরিয়ায় বাণিজ্য সফরে গমন করে হজরত মুহাম্মদ (সা.) কিশোর বয়সেই ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। তাই যুবক বয়সে উপনীত হওয়ার পর হজরত মুহাম্মদ (সা.) পারিবারিক ঐতিহ্য বজায় রেখে পেশা হিসেবে ব্যবসাকেই বেছে নেন। প্রথমদিকে তিনি মক্কা ও এর আশপাশে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসা (চধৎঃহবৎংযরঢ় ইঁংরহবংং) করতেন। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যবসায়িক অংশীদারগণের মধ্যে তাঁর চাচা হজরত আবু তালেব (রা.) ও হজরত আব্বাস (রা.), চাচাতো ভাই হজরত নওফেল ইবনে হারিস (রা.), ঘনিষ্ঠ সাথী হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), হজরত হাকিম ইবনে হিজাম (রা.), হজরত সায়েব (রা.), হজরত কায়েস ইবনে সায়েব মাখজুমি (রা.), হজরত আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই আল হামসা (রা.) প্রমুখ ছিলেন উল্লেখযোগ্য।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যবসার পরিধি আরও বাড়তে থাকে এবং তিনি আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য (ওসঢ়ড়ৎঃ ঊীঢ়ড়ৎঃ ইঁংরহবংং) শুরু করেন। এ সময় তিনি আরবের বিভিন্ন স্থান থেকে রকমারি পণ্যদ্রব্য আমদানি করে সেগুলো ইয়েমেন, আবিসিনিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতেন। প্রখর বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, কর্মদক্ষতা, সুমিষ্ট ব্যবহার, সততা, নিষ্ঠা এবং সুউচ্চ নৈতিক মূল্যবোধের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই যুবক হজরত মুহাম্মদ (সা.) ব্যবসা-বাণিজ্যে অভাবনীয় সাফল্য লাভ করেন। তিনি পণ্য ক্রয়ের সময় ন্যায্যমূল্য প্রদান করতেন, ক্রেতাদের সবসময় ভালো মানের পণ্য সরবরাহ করতেন এবং তাদের সঙ্গে আন্তরিক ব্যবহার করতেন। পণ্যদ্রব্যের ওজনে কম-বেশি করা, ন্যায্যমূল্যের চেয়ে অতি উচ্চমূল্যে পণ্য বিক্রয় করা, ত্রুটিপূর্ণ দ্রব্য বিক্রয় করা-সহ ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে যে কোনো অসাধু পন্থা অবলম্বনকে হজরত মুহাম্মদ (সা.) মনে-প্রাণে ঘৃণা করতেন। তিনি সবসময় মানুষকে ব্যবসায়িক নীতিবোধ সম্পর্কে উপদেশ প্রদান করতেন। এ সকল গুণের কারণে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বীরাও তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। নবুয়ত পূর্ব জীবনে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যবসায়িক অংশীদার হজরত সায়েব (রা.) বলেন- ‘হজরত মুহাম্মদ (সা.) আমার অংশীদার ছিলেন। লেনদেনের ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ছিলেন।’ [মদীনা পাবলিকেশন্স কর্তৃক অনূদিত সীরাতুন নবী (সা.), আল্লামা শিবলী নো’মানী (রহ.) ও আল্লামা সৈয়দ সুলায়মান নদভী (রহ.), পৃষ্ঠা ৭৫]
যুবক হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যবসায়িক সততার নিদর্শনস্বরূপ ২টি ঘটনা নিম্নে তুলে ধরছি-
ঘটনা-১: একদা হজরত মুহাম্মদ (সা.) এক ব্যক্তির নিকট কিছু উট বিক্রয় করলেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর মনে পড়ল, উটগুলোর মাঝে একটি উট অসুস্থ। এ কথা স্মরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হজরত মুহাম্মদ (সা.) ঘোড়ায় চড়ে লোকটিকে খুঁজতে লাগলেন। দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজি করার পর তিনি লোকটির সন্ধান পেলেন। অতঃপর তিনি লোকটির কাছ থেকে ওই অসুস্থ উটটিকে ফেরত নিয়ে তাকে উটটির মূল্য ফিরিয়ে দিলেন। (গঁযধসসধফ ঃযব চৎড়ঢ়যবঃ ড়ভ ওংষধস, ঋধুধষ অযসধফ, চধমব ৪৩) হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর এরূপ অসাধারণ সততায় লোকটি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল।
ঘটনা-২: হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যবসায়িক অংশীদার হজরত আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই আল হামসা (রা.) বলেন- ‘হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যুবক বয়সে একবার তাঁর সঙ্গে আমার একটি ব্যবসায়িক লেনদেন হয়। সেই সূত্রে তিনি আমার কাছে কিছু অর্থ পেতেন। একদিন আমার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। আমি তাঁকে বললাম, আপনি এখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। আমি আপনার প্রাপ্য অর্থ নিয়ে আসছি। এ কথা বলে আমি বাড়িতে গিয়ে বিভিন্ন ব্যস্ততায় তাঁকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে গেলাম। ৩ দিন পর আমার মনে পড়ল যে, আমি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অপেক্ষায় রেখে এসেছি। সঙ্গে সঙ্গে আমি ছুটে গেলাম সেই স্থানে। আমি দেখতে পেলাম- তিনি তখনো সেই স্থানে অপেক্ষা করছেন। আশ্চর্যের বিষয়, আমি তাঁকে দেওয়া ওয়াদা ভঙ্গ করে ৩ দিন ধরে তাঁকে অপেক্ষায় রেখেছি। তারপরও তাঁর চেহারায় কোনো বিরক্তির ছাপ দেখতে পেলাম না। তিনি শুধু আমাকে বললেন, তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছ। আজ ৩ দিন যাবৎ আমি এখানেই তোমার অপেক্ষায় বসে আছি।’ (হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, শায়খুল হাদীস মওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন, পৃষ্ঠা ২০৩)
ব্যবসা-বাণিজ্যে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর এরূপ সততা ও বিশ্বস্ততার কারণে কালক্রমে মক্কার সর্বস্তরের মানুষ যুবক হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ‘আল-আমিন’ অর্থাৎ বিশ্বাসী, চিরবিশ্বস্ত ও ‘আস-সাদিক’ অর্থাৎ সত্যবাদী উপাধিতে ভূষিত করে। এরই ধারাবাহিকতায় তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যবসায়ী হজরত খাদিজা (রা.)-ও হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নজিরবিহীন বিশ্বস্ততা ও সততার বিষয়ে অবগত হন। সেসময় হজরত খাদিজা (রা.) তাঁর সুবিশাল ব্যবসা পরিচালনার জন্য একজন নির্ভরযোগ্য, সৎ ও বিশ্বস্ত অংশীদার খুঁজছিলেন। তাই হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যবসায়িক সততার বিষয়ে জানতে পেরে তিনি অত্যন্ত খুশি হন। তিনি মনস্থির করেন যে, কোরাইশ বংশের মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ্কেই নিজের ব্যবসার অংশীদার করবেন। এই লক্ষ্যে হজরত খাদিজা (রা.) একদিন হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিজ বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁর ব্যবসার অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব দেন। তখন হজরত মুহাম্মদ (সা.) স্বীয় চাচা হজরত আবু তালেব (রা.)-এর সঙ্গে পরামর্শ করে বিবি খাদিজা (রা.)-এর প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। অতঃপর হজরত মুহাম্মদ (সা.) হজরত খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসায়িক অংশীদার হয়ে তাঁর সুবিশাল ব্যবসা পরিচালনার কার্যক্রম শুরু করেন। হজরত খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসার অংশীদার হওয়ার পর প্রথমেই হজরত মুহাম্মদ (সা.) বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে মক্কা থেকে সিরিয়ায় যাত্রা করেন। এ সফরে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অসাধারণ ব্যবসায়িক দক্ষতার কারণে এত বেশি মুনাফা অর্জিত হয়, যা ইতোপূর্বে কখনো হয়নি। তাই হজরত খাদিজা (রা.) খুশি হয়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে তাঁর ন্যায্য প্রাপ্য অংশের চেয়েও অনেক বেশি অর্থ উপহারস্বরূপ প্রদান করেন। এরপর নানা ঘটনা পরিক্রমার মধ্য দিয়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে হজরত খাদিজা (রা.)-এর শুভবিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহের পর উম্মুল মু’মিনিন হজরত খাদিজা (রা.)তাঁর যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও সুবিশাল ব্যবসা হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কদম মোবারকে অর্পণ করেন। প্রকৃতপক্ষে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহ্র রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) হলেন আমাদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। তাইতো মহান রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন-‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ্ ও আখিরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহ্কে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য তো রাসুলুল্লাহ্র মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সূরা আল আহযাব-৩৩ : আয়াত-২১)। সুতরাং, আজকের বিশ্বের সকল ব্যবসায়ী যদি মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রেখে যাওয়া আদর্শ অনুসরণ করে সুমিষ্ট ব্যবহার, সততা, নিষ্ঠা এবং সুউচ্চ নৈতিক মূল্যবোধের দ্বারা ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করেন, তাহলে তারা নিজেরা যেমন সফলতার শীর্ষে আরোহণ করবেন, তেমনিভাবে সাধারণ ভোক্তারাও ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ