Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124
Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124

প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের অনেক নিগূঢ় রহস্য পবিত্র কুরআনে ইঙ্গিত আকারে বর্ণিত হয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে। বিজ্ঞানের তেমনই একটি বিস্ময়কর বিষয় হলো ‘আয়রন পাইরাটাইজেশন’। আইরন পাইরাটাইজেশন (Iron Pyritization) হলো এমন একটি ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যা প্রাকৃতিকভাবে কোনো মৃত জীবদেহ বা জৈব পদার্থের অবশিষ্ট অংশকে রাসায়নিক ক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে খনিজ পদার্থে রূপান্তরিত করে থাকে। আর রূপান্তরিত এ খনিজ পদার্থটিকে বলা হয় আয়রন পাইরাইট (Iron Pyrite)।

আয়রন পাইরাইট নামক খনিজ পদার্থটি মূলত আয়রন বা লোহা (Fe) এবং সালফার (S)-এর একটি রাসায়নিক যৌগ। যার রাসায়নিক নাম হলো আয়রন-ডাই-সালফাইড (Iron Disulfide) এবং রাসায়নিক সংকেত হলো FeS2। রসায়নবিদদের মতে, আইরন পাইরাইট (FeS2)-এ প্রায় ৪৬.৭% লোহা এবং ৫৩.৩% সালফার বিদ্যমান থাকে। [“Pyrite (fool’s gold)”, Greene and Jim, EBSCO, 2022, Accessed 18 January 2026] আইরন পাইরাইট (FeS2)-এর উজ্জ্বলতা সোনালি বর্ণের হওয়ায় একে বোকার স্বর্ণ (Fools Gold) বলা হয়। মূলত জৈব পদার্থ থেকে রূপান্তরিত এ খনিজ পদার্থটি ফ্যাকাশে-পিতল হলুদ রঙের হয়ে থাকে। প্রাকৃতিকভাবে আইরন পাইরাইটে (FeS2) রূপান্তরিত হওয়ার রাসায়নিক প্রক্রিয়াটি কিন্তু বেশ চমকপ্রদ। কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদ যখন কাদার নিচে (বিশেষ করে সমুদ্রের তলে) চাপা পড়ে আর সেই স্থানে যদি অক্সিজেনের অভাব থাকে, তখন সেখানে বিশেষ কিছু ব্যাকটেরিয়া কাজ শুরু করে। অতঃপর শুরু হয় পাইরাটাইজেশন প্রক্রিয়া, যার ধাপগুলো নিম্নরূপ-
সালফেটকে সালফাইডে রূপান্তর : প্রথমে ব্যাকটেরিয়াগুলো পরিবেশে থাকা সালফেটকে সালফাইডে পরিণত করে।
লোহার সঙ্গে বিক্রিয়া : তারপর ভূগর্ভস্থ পানি বা মাটির আয়রনের (লোহা) সঙ্গে সালফাইডের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে।
স্ফটিক (Crystal) গঠন : অতঃপর এ বিক্রিয়ার ফলে আয়রন এবং সালফাইড মিলে আয়রন পাইরাইট (FeS2) নামক খনিজ পদার্থে রূপান্তিরত হয়। মাটির নিচে রূপান্তরিত এ খনিজ পদার্থগুলো ধীরে ধীরে মৃতদেহের কোষের ভেতর প্রবেশ করে। যা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সোনালি স্ফটিকের (Crystal) মতো জমাট বেঁধে মৃতদেহকে জীবাশ্মে (Fossil) রূপান্তর করে। সাধারণত একটি দেহাবশেষকে জীবাশ্ম (Fossil) হিসাবে গণ্য করতে হলে সেটি অন্তত ১০ হাজার বছর পুরোনো হতে হয়। (“Fossils”, Discovering Geology-Fossils and geological time, British Geological Survey (BGS), Accessed 18 January 2026)
প্রকৃতিতে সাধারণত হাড়, দাঁত, নখ বা কাঠের মতো শক্ত জিনিসের জীবাশ্ম বেশি দেখা যায়। তবে বিশেষ প্রক্রিয়ায় মাঝেমধ্যে প্রাণীর পায়ের ছাপ, এমনকি ডিমের জীবাশ্মও খুঁজে পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ-কোনো পাথরের ভেতর যদি একটি সোনালি রঙের শামুকের খোলস দেখা যায় যা কোটি বছরের পুরোনো, তবে সেটি হবে একটি পাইরাটাইজড জীবাশ্ম।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ! আপনারা জানলে হয়তো অবাক হবেন যে, জৈব পদার্থের আয়রন পাইরাইটে পরিণত হওয়ার এ চমকপ্রদ বিষয়টি প্রথম মাত্র ১৩৩ বছর আগে (১৮৯৩ খ্রি.) আমেরিকান বিজ্ঞানী চার্লস ইমারসন বিচার (Charles Emerson Beecher)-এর গবেষণা দ্বারা আবিষ্কৃত হয়, অথচ মহান আল্লাহতায়ালা আজ থেকে প্রায় ১৫০০ বছর আগেই বিষয়টি পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন। মূলত, অবিশ্বাসীরা যখন পুনরুত্থান দিবসের সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিল, তখন তাদের সেই প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে পবিত্র কুরআনে অবতীর্ণ হয়েছিল এক অকাট্য জবাব। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন-
[উচ্চারণ : কুল কুনু হিজারাতান আও হাদিদা। আও খালক্বাম মিম্মা ইয়াকবুরু ফী ছুদুরিকুম; ফাসাইয়াকুলুনা মাই ইউ’ঈদুনা; কুলিল্লাযি ফাতারাকুম আউওয়ালা মাররাহ।]
অর্থাৎ : “বলুন : ‘তোমরা হয়ে যাও পাথর কিংবা লোহা, অথবা এমন কোনো সৃষ্ট বস্তু, যা তোমাদের ধারণায় অত্যন্ত কঠিন, তখন তারা বলবে : কে আমাদেরকে পুনর্বার সৃষ্টি করবে? বলুন : তিনিই, যিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা বনী ইসরাইল আয়াত-৫০ ও ৫১।)
উপরিউক্ত আয়াতে ব্যবহৃত আরবি ‘হাদিদ’ শব্দের অর্থ হলো লোহা এবং আরবি শব্দ ‘হিজারাতান’-এর মানে হলো পাথর। বিস্ময়কর বিষয় হলো, আধুনিক বিজ্ঞান আজ প্রমাণ করেছে যে, মৃতদেহ শুধু পচে মাটির সঙ্গে মিশেই যায় না; বরং বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লোহা ও পাথরের (সালফাইড) উপস্থিতির কারণে ‘আয়রন পাইরাইট’ তৈরি করে। পরে যা জীবাশ্মে রূপান্তরিত হয়ে কোটি কোটি বছর টিকে থাকতে পারে। বিজ্ঞানের এ অত্যাধুনিক আবিষ্কার যেন প্রায় ১৫০০ বছর আগে কুরআনে বর্ণিত সেই কঠিন চ্যালেঞ্জেরই এক জীবন্ত ও বৈজ্ঞানিক নিদর্শন।
পরিশেষে বলা যায়, বিজ্ঞান ও ধর্ম একে অপরের পরিপূরক এবং সত্যের দুটি ভিন্ন প্রকাশ। বিজ্ঞান আমাদের কাছে উন্মোচন করে জাগতিক প্রক্রিয়ার ‘কৌশল’, আর ধর্ম ব্যাখ্যা করে সেই সৃষ্টির পেছনের ‘উদ্দেশ্য’। আয়রন পাইরাটাইজেশনের মতো বৈজ্ঞানিক সত্যগুলো পবিত্র কুরআনের শাশ্বত বাণীরই এমন এক প্রতিচ্ছবি, যা প্রমাণ করে, বিশুদ্ধ জ্ঞান এবং ঐশী প্রজ্ঞার মধ্যে কোনো মৌলিক বিরোধ নেই। আধুনিক বিজ্ঞান যতই উন্নতির শিখরে আরোহণ করছে, পবিত্র কুরআনের নিগূঢ় রহস্যগুলো ততই স্পষ্টভাবে আমাদের সামনে ধরা দিচ্ছে। ধর্ম ও বিজ্ঞানের এ অনন্য মেলবন্ধন শুধু মানুষের বিচারবুদ্ধিকে প্রখর করে না, বরং মহান আল্লাহতায়ালার অসীম ক্ষমতা উপলব্ধি করার মাধ্যমে আমাদের বিশ্বাসকে করে তোলে আরও সুদৃঢ় ও বিজ্ঞানমনস্ক।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ